চট্টগ্রামের হিন্দু মেয়ে মিনা পালের মুসলিম মেয়ে কবরী হয়ে ওঠার গল্প…

চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর পোপাদিয়া ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন অভিনেত্রী কবরী। ১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই। জন্মস্থান বোয়ালখালী হলেও শৈশব ও কৈশোর বেড়ে ওঠা চট্টগ্রাম নগরেই। তার আসল নাম মিনা পাল৷ পিতা শ্রীকৃষ্ণ দাস পাল এবং মা শ্রীমতি লাবণ্য প্রভা পাল৷ ১৯৬৩ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে নৃত্যশিল্পী হিসেবে মঞ্চে আবির্ভাব কবরীর৷ তারপর টেলিভিশন ও সবশেষে সিনেমায়।

মিনা পাল থেকে নায়িকা কবরী হয়ে ওঠার গল্প খুবই চমকপ্রদ। তখন তিনি চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গি বাজারের জে এম সেন স্কুলে পড়তেন। ১৯৬৪ সালে ক্লাস সেভেন উঠেই সিনেমার নায়িকা হয়ে গেলেন। সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ ছবিটির জন্যে মিনা পালের নাম বদলে হয়ে গেলেন কবরী। কবরী অর্থ খোঁপা। কেশ সজ্জা। প্রথম ছবিতেই ভূবনমোহিনী হাসির জন্যে কবরীর নাম হয়ে গেলো মিষ্টি মেয়ে। পাশের বাড়ির মেয়ে। চট্টগ্রামের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী চিত্ত চৌধুরী ছিলেন সুতরাং ছবির অন্যতম প্রযোজক।

কবরী প্রথমে চিত্ত চৌধুরীকেই বিয়ে করেছিলেন। সম্পর্ক বিচ্ছেদের পর ১৯৭৮ সালে তিনি বিয়ে করেন সফিউদ্দীন সরোয়ারকে। ২০০৮ সালে তাদেরও বিচ্ছেদ হয়ে যায়। কবরীর রয়েছে পাঁচ সন্তান।কবরী হয়ে ওঠার গল্পটি সারাহ বেগম কবরী তার জীবনীগ্রন্থ ‘স্মৃতিটুকু থাক’-তে নিজেই লিখেছেন। নায়িকা হিসাবে তাকে সুভাষ দত্তের পছন্দ করাটা ছিল অনেকটা তখনকার যুগের বিয়ের কনে দেখার মতো!

সুভাষ দত্ত তাকে দেখতে গিয়ে বলেন, এই মেয়ে একটু দাঁড়াও তো। এরপর বললেন পেছনে ঘোরো! আবার সামনে হেঁটে দেখাও! এরপর বলেন চুল দেখি। দাঁত দেখি! সুভাষ দত্ত এভাবে একের পর এক বলেই যাচ্ছিলেন।একপর্যায়ে বলেন, কথা নিশ্চয় বলতে পারো। কিশোরী মিনা পাল তখন বিরক্ত হয়ে মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক ইশারা করেন। সুভাষ দত্ত বলেন, মাথা নাড়লে চলবে না। শব্দ করে বলো, তোমার নাম কী? মিনা পাল চুপ।

সুভাষ দত্ত আবার বললেন, ‘নাম কী’? মিনা পাল জবাব দেন, ‘মিনা’। পুরো নাম বলো। ‘মিনা পাল’। সুভাষ দত্ত বললেন- সংলাপ বলো, ‘অ্যাই ছাড়ো, কেউ দেখে ফেলবে’। ‘দেখি তুমি অভিনয় করতে পারও কিনা’। এভাবেই সুতরাং ছবির ইন্টারভ্যু শুরু হয়। মিনা পাল সাহস পাচ্ছিলেন না। বুকের ভেতর যেন কেউ হাতুড়ি পেটাচ্ছে। বাবাকে মনে প্রানে অভিশাপ দিচ্ছিলেন বার বার।কারণ বাবা শ্রীকৃষ্ণ দাশ পালই তাকে ওখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। সুভাষ দত্ত এক রকম ধমকের সুরে বললেন, ‘আরে মেয়ে চুপ করে আছো কেনো?’ এরপর একটু মোলায়েম করে বললেন, ‘বলো, প্লিজ বলো।’

এবার একটু স্বস্তি পেয়ে আস্তে আস্তে সংলাপ বললেন মিনা পাল। সংলাপ শুনে সুভাষ দত্ত বলেন, ‘এ তো দেখি চাঁটগাইয়া গলার সুর। উঁহু চলবে না। কথা ঠিক করে বলতে হবে।’এরপর সেখানে ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশন রোডের কে ফটোগ্রাফার্সের খালেক সাহেব আসেন। তিনি কিছু ছবি তুললেন মিনা পালের। ডার্করূম থেকে ছবি ওয়াশ করে পাঠিয়ে দিলেন।

কিশোরী মিনা পালের জন্যে আনা হলো শাড়ি, ব্লাউজ, কাঁচের চুড়ি। তার বাবার তখন হাসি হাসি মুখ। বাবার যেন মনে হচ্ছে তার মেয়েকে তাদের পছন্দ হয়েছে। মেয়ে সিনেমার নায়িকা হবে এটাতো বড় একটি স্বপ্ন।সুভাষ দত্ত এক পর্যায়ে তার বাবাকে বললেন, ‘কৃষ্ণ বাবু, কাল বিকেল ৩টায় আর কে মিশন রোডে মিনাকে নিয়ে আমাদের অফিসে চলে আসবেন। রিহার্সাল হবে।’ এর মানে মিনা পাল পাস!

এভাবে ঢাকার ছবির জগতের নতুন একটি অধ্যায়ের শুরু। চট্টগ্রাম থেকে মিনা পাল, তার বাবা আর দিদি ঢাকায় এসে সদরঘাটের এক হোটেলে ওঠেছিলেন। সেখান থেকে রামকৃষ্ণ মিশন রোডে রিহার্সালে যেতেন। কথা মতো পরের দিন তারা প্রযোজকের অফিসে গেলেন। এক হাজার এগারো টাকা দিয়ে সাইন করলেন মিনা পাল। এটি তার জীবনের প্রথম রোজগার।

রিহার্সালের প্রথম দিনে তাকে নেওয়া হলো কে ফটোগ্রাফার্সে। আজকের যেটি সিএনজি, তখন এটির নাম ছিল বেবি ট্যাক্সি অথবা অটো রিকশা। তেমন অটো রিকশায় করে বাবার সঙ্গে রিহার্সেলে যেতেন মিনা পাল ওরফে কবরী। পরে ওই সড়কেই একটি বাসা ভাড়া নেওয়া হয়।

প্রথম দিনেই কে ফটোগ্রাফার্সে তার নানা অ্যাঙ্গেলের ছবি তোলা হয়। করা হয় ভয়েস টেস্ট। শাড়ি পরিয়ে তোলা হয় ছবি। তার সামনের দাঁতে পোকা হয়েছিল। সেটি পড়ে মাত্র নতুন দাঁত উঠতে শুরু করেছে।সুভাষ দত্ত নিজে বেঁটেখাটো গড়নের ছিলেন। এর জন্যে তার বিপরীতে মিনা পালের মতো একজন বেঁটেখাটো নায়িকা তিনি পছন্দ করেন। তার নতুন দাঁতের নিচে ঢেউ ঢেউ ছিল। এর জন্যে তাকে পছন্দ করেছিলেন সুভাষ দত্ত।

সে সময়ের স্মৃতিচারণে কবরী বলেছিলেন, “শুরু হলো আমার নাম নিয়ে গবেষণা। দাদা সৈয়দ শামসুল হককে আমার একটা নাম ঠিক করে দেওয়ার জন্য বললেন। যে নামেরই প্রস্তাব আসে, দেখা যায় এই নামে কেউ না কেউ আছে। আবার কোনো কোনো নাম দাদার পছন্দ হয় না। একবার ঠিক হলো যে ‘করবী’ দেওয়া হবে। কেউ আবার বলল না, ‘কবরী’। দুটো নাম নিয়ে বেশ ভাবনাচিন্তা চলল। শেষমেষ ‘কবরী’ নামটাই টিকে গেল। আর ‘মীনা পাল’ থেকে আমি হয়ে গেলাম ‘কবরী’।”‘সুতরাং’ এ কিশোরী প্রেমিকা জরিনার ভূমিকায় এভাবে মিনা পালের অভিষেক হয়ে যায় কবরী নামে। ‘সুতরাং’ ছবি মুক্তির পর চারদিকে হৈচৈ পড়ে যায়। ছবিটি সুপার ডুপার ব্যবসা করে।

ঢাকায় ভালো ব্যবসার পাশাপাশি কম্বোডিয়ার একটি চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি পুরষ্কৃত হয়। আজকের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের ভবনটি আগে শাহবাগ হোটেল ছিল। সেখানে সম্বর্ধনা দেওয়া হয় ছবির পুরো টিমকে। ওই ছবির পর ছবির অন্যতম প্রযোজক চিত্ত চৌধুরী কিশোরী নায়িকাকে বিয়েও করে নেন। তার প্রথম ছেলে ‘বাবুনি’র জন্মের পর কবরী সুযোগ পান জহির রায়হানের উর্দু ছবি ‘বাহানা’য়।ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি যা করতেন সেটাই অভিনয় হয়ে যেত। এমন দ্বিতীয় কাউকে কী কোন দিন বাংলাদেশ পাবে? ভালো থাকবেন প্রিয়দর্শিনী।