বিশ্বকাপে মেসির গায়ে রাজকীয় পোশাক বগুড়ার তৈরি

বগুড়া সদরের এরুলিয়া ইউনিয়নের হাপুনিয়া গ্রামে তৈরি হয় সৌদি আরব ও কাতারের রাজকীয় পোষাক ‘বেস্ত’। প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘বেস্ত আল নুর’। এ কারখানায় তৈরি হয় মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কাতার, দুবাই সহ বিভিন্ন দেশের রাজা-বাদশাহ, শেখদের পরিহিত রাজকীয় পোশাক বিস্ত ও আভায়া। এবার সেই ‘বেস্ত’ বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২২ এর বিশ্বকাপ জয়ী দল আর্জেন্টিনার সাদা আকাশী রঙের দলপতি লিওনেল মেসির গায়ে। কাতারের দোহায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় তার গায়ে এই রাজকীয় পোশাকটি পড়িয়ে দেন শেখ তামিম। তবে কাতারে মেসির গায়ে পড়িয়ে দেয়া ‘বেস্ত’ আসলেই বগুড়ার তৈরি কিনা তা ফিফা কর্তৃপক্ষের থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।মূলত বিস্ত ও আভায়া পড়েন শেখ’রা। তারা এটিকে রাজকীয় পোশাক ও নিজেদের বর্হিপ্রকাশে ব্যবহার করে থাকেন। বেস্ত আল নূর এর তৈরি পোশাক মেসির গায়ে পড়ানো হয়েছে এমন একটি

পোস্ট ফেসবুকে করেছেন এই পোশাক কোম্পানির পরিচালক রবিউল ইসলাম। তিনি বর্তমানে কাতারের দোহায় অবস্থান করছেন। চাহিদা মাফিক বেস্ত তৈরি হয় এই কারখানায়। প্রয়োজন চাহিদা মাফিক একেকটি বেস্তর দাম শুরু শুরু ৮০ হাজার টাকা থেকে ২ লাখ অব্দি।জানা গেছে, বগুড়ায় তৈরী হওয়া ‘বেস্ত’ মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলোর রাজা-বাদশাদের ঐহিত্যবাহী পোশাক। প্রায় ১৩ বছর আগে বগুড়া সদরের এরুলিয়া হাপুনিয়া এলাকায় নিজ বাড়িতে ‘বেস্ত আল নূর’ নামে একটি কারখানা গড়ে তোলেন নূর আলম নামের এক কাতার প্রবাসী। এবার কাতার বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে চাহিদা বাড়তে থাকে বেস্ত’র। সেই অনুযায়ী কারখানায় চাহিদা মাফিক বেস্ত তৈরিতে কাজ শুরু করে কর্মীরা। বিদেশি কাপড়ে হাতের কাজের নকশায় ‘বেস্ত’ তৈরি হচ্ছে। ‘বেস্ত আল নূর’ নামে কারখানায় এই এলাকার নারী-পুরুষ মিলে ৩০ জন শ্রমিক

কাজ করছেন।কাঁচামাল হিসেবে কাপড় থেকে পূর্ণ একটি ‘বেস্ত’ তৈরি হতে ছয়টি ধাপ পার করতে হয়। ধাপ গুলো হলো বাতানা, হেলা, তোঘরোক, বুরুজ, মাসকারে, বরদাদ ও সিলালা। তারপর প্যাকেজিং করে ‘বেস্ত’ এর পূর্ণাঙ্গ রুপ হয়। এই কারখানা থেকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২ কোটি টাকার পোশাক বিক্রি করা হয়। এই হিসাবে এই কারখানা থেকে প্রতি বছর গড়ে ২৪ কোটি টাকার পোশাক বিক্রি করা হয়। তবে এখনো তাদের অনেক চাহিদা। এই পোশাকের বাংলাদেশে কোনো চাহিদা নেই। সবগুলো পোশাক-ই যায় সৌদি আরবে কিংবা কাতারে। প্রতিটি ‘বেস্ত’ নকশাভেদে সেখানে ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকায় বিক্রি হয়।সোমবার (১৯ ডিসেম্বর) দুপুরে বেস্ত আল নূর কারখানার দায়িত্বে থাকা মো: মানিক জানান, এটা আমাদের অনেক গর্বের বিষয়। আমাদের কারখানায় নানা ধরনের বেস্ত তৈরি করা হয় চাহিদা অনুসারে। প্রায় ৫ বছর ধরে

কাজ করছেন এই কারখানায়। প্রতিমাসে বেস্ত তৈরিতে ভাল সময় কাটে। মেসির গায়ে যে বেস্ত পড়ানো হয়েছে তা যদি আমাদের তৈরি হয় তবে তা অবশ্যই আনন্দের হবে। এই কারখানা নিয়মিত ২৫/৩০ জন শ্রমিক কাজ করেন বলেও জানান তিনি।বেস্ত আল নূর কারখানার মালিক নূর আলম জানান, প্রায় ২০ বছর আগে শ্রমিক হিসেবে সৌদি আরবে ছিলেন। সেখানে বিশেষ ধরনের এই পোশাক তৈরি কারখানায় কাজ করেন তিনি। এক পর্যায়ে ‘বেস্ত’ তৈরিতে হাতের কাজের সবগুলোতে দক্ষ হয়ে ওঠেন তিনি। সৌদিতে থাকার কয়েক বছর পর নূর আলম কাতারে যান। সেখানেও নূর আলম এই বিশেষ ধরনের পোশাক তৈরির কারখানায় কাজ শুরু করেন। পরে দেশে এসে নূর আলমসহ ১০ জন শ্রমিক মিলে বেস্ত তৈরির কাজ শুরু করেন। নূর আলম প্রায় সময়ই এখন কাতার কিংবা সৌদি আরবে থাকেন। কারণ কাতারে তার ‘বেস্ত’ বিক্রির

শোরুম রয়েছে।আর সৌদি আরবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা দোকানে তিনি দেশে তৈরি ‘বেস্ত’ পাইকারি মূল্যে যোগান দেন। বাংলাদেশ ছাড়াও বর্তমানে কাতারের দোহাতে ‘বেস্ত আল সালেহ’ নামের আরেক একটি কারখানা তৈরি করেছেন তিনি। বেস্ত আল নূর এন্টারপ্রাইজের কাতারের ব্যবসা দেখাশোনা করেন রবিউল ইসলাম রনি (সম্পর্কে নূর আলমের জামাই)।কাতারের দোহায় অবস্থানরত রবিউল ইসলাম রনি প্রতিবেদককে জানান, আমাদের কারখানায় তৈরি বেস্ত/বিশুত এবার মেসির গায়ে উঠেছে। যে বেস্তটি মেসি পড়েছেন সেটি ‘বিস্ত আল সালেম’ কোম্পানির সেখানে আমরা বেস্ত সরবরাহ করে থাকি। তাই আবেগে ফেসবুকে পোস্ট করেছি। আমাদের কারখানার তৈরি বিশুত/বেস্ত মেসির গায়ে। এটা যদি সত্যি হয় তবে তা, আমাদের জন্য অনেক গর্বের, আমাদের অনেক বড় প্রাপ্তির। বিশ্বসেরা মেসির গায়ে আমাদের তৈরি পোশাক থাকলো। তবে

এটা নিশ্চিত যে, যে কোম্পানির বেস্ত মেসিকে পড়ানো হয়েছে। সেই কোম্পানিতে আমরাও বেস্ত ও আভায়া সরবরাহ করে থাকি। তাই মেসিকে পড়িয়ে দেয়া বেস্ত দেখে মনে হয়েছে সেটা আমাদের কোম্পানির। আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। তাই পোস্ট দিয়েছি ফেসবুকে।তিনি আরও বলেন, বেস্ত তৈরির কাঁচামাল, স্বর্ণের সুতা ইত্যাদি কাতার থেকে আমদানি করতে হয়। কারণ এই মানের সুতা বাংলাদেশে বা তার আশপাশে নেই। কিন্তু সুতা বা অন্যান্য কাঁচামাল আমদানি বা রপ্তানির ক্ষেত্রে অনেক রকমের ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়। এগুলো সহজ করা গেলে আমাদের জন্য ভালো হতো। একই সাথে আমাদের দেশের বেকার নারী-পুরুষদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এই কাজ শেখানো গেলে তারাই সম্পদে পরিণত হবে।