রহিমার আত্মগোপনের নাটক সন্তানরাও জানত

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসছে খুলনার দৌলতপুরের ‘নিখোঁজ’ হওয়া নারী রহিমা বেগমের অপহরণ নাটকের সব অজানা তথ্য। ময়মনসিংহের মরদেহ উদ্ধার থেকে ফরিদপুরে আত্মগোপন সব খবরই জানতেন তাঁর মেয়ে মরিয়ম মান্নম্নান ও পরিবারের সদস্যরা। ‘জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে পরিকল্পিতভাবে আত্মগোপন করেছিলেন রহিমা বেগম’- এমন অভিযোগ রহিমাকে অপহরণ মামলায় আটক ৫ জনের পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসীর। প্রশ্ন উঠেছে, আত্মগোপনে থেকে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর এমন আয়োজন করেছিলেন তিনি! উদ্ধারের ১৫ ঘণ্টা পর রহিমা বেগম দাবি করেছেন, তাঁকে অপহরণ করা হয়। তবে তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, তাঁর বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য নয়।এদিকে, রহিমা বেগমকে তাঁর মেয়ে আদুরির জিম্মায় জামিনে মুক্তি দিয়েছেন আদালত। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় খুলনা মহানগর হাকিম সারওয়ার আহমেদ ২২ ধারায় রহিমার জবানবন্দি গ্রহণ করেন। পরে আইনজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন।পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বলেন, এই ঘটনটি নিবিড়ভাবে তদন্ত চলছে। রহিমা ও তাঁর মেয়ের বক্তব্যে অনেক অসংলগ্নতা আছে।

খুলনার দৌলতপুর থানার মহেশ্বরপাশা এলাকার নিখোঁজ হওয়া রহিমা বেগম অক্ষত অবস্থায় ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলা থেকে উদ্ধার হন। ফরিদপুরের বোয়ালমারী থানার ওসি মুহাম্মদ আব্দুল ওহাব জানান, শনিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় রহিমা বেগম যে বাড়িতে ৭ দিন আত্মগোপনে ছিলেন সেই বাড়ির তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য খুলনার পুলিশ থানা হেফাজতে নিয়েছে। তাঁরা হলেন- বাড়ির মালিক কুদ্দুস মোল্লার স্ত্রী হিরা বেগম (৫০), ছেলে আলামিন বিশ্বাস (২৫) ও ছোট ভাই আবুল কালামের স্ত্রী রাহেলা বেগম (৪৫)। তাঁরা এখন খুলনা পিবিআইর জিম্মায়। কুদ্দুস মোল্লা বর্তমান বোয়ালমারী উপজেলা ডোবরা জনতা জুট মিলের একজন কর্মচারী।বোয়ালমারীর সৈয়দপুর গ্রামের কুদ্দুস মোল্লার ভাগনে জয়নাল জানান, আমার মামা কুদ্দুস খুলনা শহরের মীরেরডাঙ্গা এলাকার সোনালি জুট মিলে চাকরির সুবাদে খুলনার মহেশ্বরপাশা এলাকার নিখোঁজ হওয়া রহিমা বেগমের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। আমি ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে রহিমা বেগমের মেয়ে মরিয়ম মান্নানের স্ট্যাটাস থেকে বিষয়টি জানতে পারি। তারপর ওই ছবিটি রহিমা বেগমকে দেখিয়ে বলি, এটা আপনার ছবি কিনা; ওই সময় রহিমা বেগম হতভম্ব্ব হয়ে বলেন, আমার ছবির মতোই তো লাগছে। তাঁর মেয়ের ফেসবুক স্ট্যাটাসে দেওয়া দুটি মোবাইল নম্বরে (০১৭৭১১০০২০২, ০১৫৫৮৩৪৯৯০৫) যোগাযোগ করলে রহিমা বেগমের ছেলে মো. সাদী ওরফে মিরাজের স্ত্রী ফোনটি রিসিভ করেন। রহিমা বেগমের বিষয়টি তাঁদের বললে তাঁরা ওই নম্বরে আর ফোন দিতে নিষেধ করেন। তারপর থেকে আমার সন্দেহ হলে রহিমা বেগমকে না জানিয়ে তাঁর বিষয়টি শনিবার দুপুরে স্থানীয় ইউপি সদস্য মোশারফ হোসেনকে জানাই। তিনি খুলনার ২ নম্বরের ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাইফুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হন নিখোঁজ হওয়া রহিমা বেগমই ওই নারী।

বোয়ালমারী সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. মোশারফ হোসেন বলেন, কাউন্সিলর সাইফুল ইসলাম আমার পূর্বপরিচিত। রহিমা বেগমকে না জানিয়ে আমরা কাউন্সিলর সাইফুলকে সবকিছু খুলে বললে তাঁরা খুব দ্রুত রহিমা বেগমকে নিয়ে যাবেন বলে জানান। রহিমা বেগম যাতে পালিয়ে না যান সে বিষয়ে আমাদের নজর রাখতে বলেন কাউন্সিলর। পরে শনিবার রাতে খুলনা ও বোয়ালমারী থানা পুলিশের উপস্থিতিতে রহিমা বেগমকে খুলনায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।অপহরণের দাবি রহিমার: উদ্ধারের প্রায় ১৫ ঘণ্টা নির্বাক ছিলেন রহিমা বেগম। রোববার দুপুরে মরিয়ম মান্নানসহ ৫ সন্তানের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও কথা বলার পর মুখ খোলেন তিনি। পিবিআইর কাছে দাবি করেন, তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তবে তাঁর জবানবন্দি নিয়ে ধূম্র্রজাল তৈরি হয়েছে।খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (নর্থ) মোল্লা জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, গাড়িতে করে আনার সময় রহিমা বেগম কীভাবে নিখোঁজ হয়েছিলেন এবং ২৮ দিন কোথায় কোথায় ছিলেন সে প্রশ্ন করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দেননি। রাতে থানায় আনার পর প্রশ্ন করলেও তিনি নিশ্চুপ ছিলেন।গতকাল দুপুরে প্রেস ব্রিফিংয়ে পিবিআই খুলনার পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান জানান, রহিমা বেগম নিখোঁজ হওয়ার পর বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও মুকসুদপুর ঘুরে ১৭ আগস্ট ফরিদপুরে কুদ্দুস মোল্লার বাড়িতে যান। ৭ দিন ওই বাড়িতেই ছিলেন তিনি।পুলিশ সুপার বলেন, গত কয়েক দিন মরিয়ম মান্নান ফেসবুকে অনেক পোস্ট দিয়ে বিভ্রান্ত করেছেন। একটি সোর্স থেকে শুনেছি, রহিমা তার ছেলে-মেয়ে ও স্বামী কারও সঙ্গেই দেখা করতে চান না এবং কারও কাছেই যেতে চান না।

প্রেস ব্রিফিংয়ের পর সাংবাদিকরাও তিনি কোথায় ছিলেন জানতে চাইলে মুখ খোলেননি রহিমা বেগম। এ সময় রহিমা বেগমের সঙ্গে দেখা করেন তাঁর মেয়ে মরিয়ম মান্নান, আদুরি আকতার ও ছেলে মো. সাদীসহ ৫ সন্তান। এ সময় মেয়েরা মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন।দীর্ঘ ১৫ ঘণ্টা নির্বাক থাকার পর পিবিআই পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান ও অপহরণ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক আবদুল মান্নানের কাছে মুখ খোলেন রহিমা বেগম। পুলিশ সুপার জানান, রহিমা দাবি করেছেন, গত ২৭ আগস্ট রাতে তিনি বাড়ির সামনে পানি আনতে গেলে ৩-৪ জন তাঁর নাকে কিছু একটা দিয়ে অজ্ঞান করে ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু কোথায় নিয়ে যায় তা তিনি বলতে পারেন না। অনেক দূরে কোথাও নিয়ে যায়। নেওয়ার পর অনেকগুলো ব্ল্যাঙ্ক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয়, তখন সেখানে যাদের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ, সেই গোলাম কিবরিয়া ও মহিউদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা তাঁকে বলেন যে, তোকে প্রাণে মারলাম না, মারলে তো মার্ডার কেস খাব। সে জন্য তোকে ছেড়ে দিলাম।পুলিশ সুপার বলেন, ছেড়ে দেওয়ার পর হাঁটতে হাঁটতে মনি নামে এক মেয়ের সঙ্গে দেখা হয় এবং তাঁর বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। সেখানে কিছুদিন ছিলেন, তারপর তাঁদের কাছ থেকে ১ হাজার টাকা নিয়ে বাসে চড়ে মোকসেদপুরে যান। সেখান থেকে ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে কুদ্দুস মোল্লার বাড়িতে যান। তবে এক হাজার টাকা নিয়ে রহিমা কীভাবে এত এলাকায় প্রায় এক মাস ঘুরলেন, সেই প্রশ্নও উঠেছে।কেন তিনি খুলনায় না এসে ফরিদপুর গেলেন এবং কেন সন্তানদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেননি- সে প্রশ্নের উত্তরে রহিমা পুলিশ সুপারকে জানান, খুলনায় আসেননি ভয়ে। আর নিজের কোনো মোবাইল না থাকায় এবং সন্তানদের মোবাইল ফোন নম্ব্বর মুখস্থ না থাকায় যোগাযোগ করতে পারেননি।ওই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, রহিমার দাবি, তার ওপর যখন হামলা হয়, তখন তার স্বামী দোতলা থেকে তাকিয়ে দেখছিলেন। তখন রহিমা তার স্বামীকে বলেন যে, তোমাকে ওরা মেরে ফেলবে তুমি তাড়াতাড়ি ঘরের মধ্যে যাও। তখন তাঁর স্বামী ঘরে গিয়ে দরজা দেন। তিনি বলেন, রহিমার স্বামী বেলাল এ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাঁকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

পিবিআই বলছে, বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য নয়: মামলার তদারক কর্মকর্তা পিবিআই পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বলেন, রহিমার কাছ থেকে একটি শপিং ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে। ব্যাগের মধ্যে ওড়না, হিজাব, আয়না, শাড়ি, চোখের ড্রপ, ব্যবহূত সালোয়ার-কামিজ ও ক্রিম ছিল। স্ব্বাভাবিকভাবে কাউকে অপহরণকারীরা নিয়ে গেলে এই জিনিসগুলো তাঁর সঙ্গে থাকার কথা নয়।তিনি আরও জানান, বিকেলে রহিমা বেগমকে মহানগর হাকিম আদালতে পাঠানো হয়। ২২ ধারায় তাঁর জবানবিন্দ রেকর্ড করেন আদালত। এ ছাড়া রহিমাকে আশ্রয়দাতাদের তিনজনকে পিবিআইর কাছে হস্তান্তর করা হয়।ক্ষোভ গ্রেপ্তার স্বজনের: রহিমাকে উদ্ধারের খবর পেয়ে শনিবার রাতে দৌলতপুর থানায় ছুটে যান এ মামলায় আটক রফিকুল আলম পলাশ ও নুরুল আলম জুয়েলের বাবা আনসার উদ্দিন আহমেদ। তিনি সমকালকে বলেন, তাঁর ছোট ছেলে পলাশ চাকরি করে এবং বড় ছেলে জুয়েল মুদি দোকানি। তাঁর দুই ছেলেকে রহিমার কথিত অপহরণের মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁরা হয়রানির শিকার হয়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, রহিমা বেগমের স্ব্বামী আবদুল মান্নান হাওলাদার ২০১১ সালের ৭ আগস্ট মারা যান। রহিমার ঘরে তার ৫ মেয়ে ও ১ ছেলে রয়েছে। দৌলতপুর থানার মহেশ্বরপাশা এলাকায় মান্নানের জমির পরিমাণ ১৯ দশমিক ৩৪ শতক। মান্নানের আগের স্ত্রীর ২ ছেলে মিজান ও কবীর ২০১৯ সালে গোলাম কিবরিয়া ও মহিউদ্দিনের কাছে মোট ৪ দশমিক ৮৬ শতক জমি বিক্রি করেন। গোলাম কিবরিয়া ও মহিউদ্দিন ওই জমিতে দখলে যাওয়ার চেষ্টা করলে রহিমা বেগম ও তাঁর সন্তানদের সঙ্গে তাঁদের বিরোধ শুরু হয়।এ মামলায় আটক মহিউদ্দিন ও গোলাম কিবরিয়ার বড় ভাই নজরুল ইসলাম বলেন, রহিমা বেগমের তিন বিয়ে। মেয়ের ঘটকালি করতে আসেন বেলাল, সর্বশেষ রহিমা বেগম তাঁকে বিয়ে করেন। তবে পরের দুই স্বামীর ঘরে তাঁর সন্তান নেই। তিনি বলেন, তাঁর ছোট ভাই গোলাম কিবরিয়া রহিমার সৎছেলের কাছ থেকে জমি কেনে। সেই জমিতে যাতে যেতে না পারে, সে জন্য আত্মগোপন করে অপহরণ মামলা দিয়ে তাঁকে আটক করিয়েছে।নজরুল আরও বলেন, রহিমার মেয়ে মরিয়ম মান্নান নাটকবাজ। পুলিশ ও সাংবাদিকদের মিথ্যা কথা বলে প্রায় এক মাস বিভ্রান্ত করেছে। সে মাদকাসক্ত। ময়মনসিংহে গিয়েও মরিয়ম নাটক সাজায়। এ মামলায় আটক হেলাল শরীফের মেয়ে নবম শ্রেণির ছাত্রী আন্তারা ফাহমিদা বলে, তার বাবা কোনো অপরাধ করেনি, অথচ তারপরও তাকে জেল খাটতে হচ্ছে। তাদের পরিবারের সদস্যরা নানা কটূক্তির শিকার হয়েছে।ময়মনসিংহের লাশটি কার: ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, গত শুক্রবার ময়মনসিংহের ফুলপুর থানায় গিয়ে মরিয়ম মান্নান দাবি করেছিলেন, সেখানে উদ্ধার হওয়া গলিত লাশটিই তার মায়ের। কিন্তু শনিবার রহিমাকে খুঁজে পাওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে, ফুলপুরে উদ্ধার লাশটি কার? মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ফুলপুর থানার পরিদর্শক আবদুল মোতালিব চৌধুরী বলেন, মরিয়মের আবেদনের পর শনিবার ডিএনএ পরীক্ষার জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছে। যেহেতু মরিয়মের মাকে পাওয়া গেছে, তাই ডিএনএ পরীক্ষার দরকার নেই।